ঢাকামঙ্গলবার , ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
    • অন্যান্য

    প্রত্যাশা, গণভোট এবং প্রথম দিনের বার্তা

    গণচিত্র ডেস্ক
    ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬ ১১:৪২ অপরাহ্ণ

    লেখক: আসিফ কামাল

    গণভোটে অংশ নেওয়া মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝা কঠিন নয়। ভোটের বাক্সে একটি ‘হ্যাঁ’ মানে শুধু একটি মত নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘদিনের জমে থাকা প্রত্যাশা, ক্ষোভ, স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের একটি নকশা। সেই জায়গা থেকেই মানুষ ভেবেছিল, রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের পথও খুলবে।

    কিন্তু ক্ষমতায় এসে সংবিধান সংস্কারের শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত যেন শুরুতেই একটি স্পষ্ট সংকেত দিয়ে দিল। বার্তাটি খুব সরল: রাষ্ট্র কাঠামোর গভীর পরিবর্তন এখন অগ্রাধিকার নয়।

    এখানেই হতাশার জন্ম। কারণ এই নির্বাচন ছিল শুধু সরকার পরিবর্তনের ভোট নয়, বরং অনেকের কাছে এটি ছিল ব্যবস্থার পরিবর্তনের ভোট। মানুষ ভেবেছিল, এবার হয়তো রাজনৈতিক দলগুলো বুঝেছে যে পুরোনো পথে হাঁটলে আর আস্থা ফেরানো যাবে না। কিন্তু প্রথম দিনেই সেই আশার ওপর একটি ভারী ছায়া পড়েছে।

    রাজনীতিতে প্রতীকী পদক্ষেপের গুরুত্ব অনেক। শপথের ভাষা, প্রথম সিদ্ধান্ত, প্রথম ঘোষণা—এসবই নতুন সরকারের মানসিকতা বোঝার জানালা। সেই জানালায় মানুষ যখন সংস্কারের প্রতিশ্রুতির ছাপ খুঁজে পায় না, তখন হতাশা শুধু রাজনৈতিক নয়, মানসিকও হয়ে ওঠে।

    এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি দাঁড়ায়: গণভোটের অর্থ কী ছিল? যদি জনগণের একটি বড় অংশ কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে ভোট দিয়ে থাকে, তবে সেই প্রত্যাশাকে প্রথম দিনেই উপেক্ষা করা কি রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, নাকি পুরোনো রাজনীতির স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা?

    বাস্তবতা হলো, ক্ষমতা রাজনীতিকে দ্রুত বাস্তববাদী করে তোলে। বিরোধী দলে থাকাকালীন সংস্কার সহজ শোনায়, কিন্তু ক্ষমতায় এসে সেটি হয়ে যায় ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তবু মানুষের প্রত্যাশা ছিল, অন্তত একটি প্রতীকী প্রতিশ্রুতি থাকবে। একটি বার্তা থাকবে যে পরিবর্তনের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

    এই প্রেক্ষাপটে মানুষের প্রতিক্রিয়াও খুব অস্বাভাবিক নয়। প্রত্যাশা কমে যায়, আস্থার জায়গা সংকুচিত হয়, আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মূল্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। গণতন্ত্রে এটি বিপজ্জনক একটি ধাপ, কারণ আস্থার ঘাটতি তৈরি হলে রাজনীতির প্রতি মানুষের আগ্রহ ধীরে ধীরে কমে যায়।

    এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ক্ষতি কোনো দলের নয়, বরং আস্থার। জনগণ ও রাজনীতির মধ্যকার যে সূক্ষ্ম বিশ্বাসের সুতো, সেটিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

    রাজনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রত্যাশার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে। সেই প্রত্যাশা যতবার ভাঙে, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতির মূল্য ততটাই কমে যায়।

    বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরের জন্য এই বার্তাটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষমতার শুরুতে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোই ঠিক করে দেয় ভবিষ্যতের রাজনৈতিক আখ্যান কোন দিকে যাবে—পরিবর্তনের দিকে, নাকি পরিচিত চক্রের পুনরাবৃত্তির দিকে।

    বাংলাদেশ এখন ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।